ভিডিও এডিটিং শেখার উপায়

ভিডিও এডিটিং কি? এর মার্কেটে ভ্যালু কেমন? ভিডিও এডিটিং শেখার উপায়

আমরা যারা মুভি দেখতে পছন্দ করি তারা সবাই জানি এডিটিং একটি ভিডিও কে  কতো সুন্দর করে তোলে। স্পেশাল ইফেক্টস, ভিএফএক্স, গ্রাফিক্স ইত্যাদির সমন্বয়ে কল্পনা কে বাস্তবের মতো দেখছি। ইউটিউব খুললেই আমরা বিভিন্ন রকমের ভিডিও ফুটেজ দেখি। ফুটেজ ধারন করার সময় যেরকম থাকে তা বিভিন্ন ইফেক্ট দিয়ে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়। 

অনুভূতি প্রকাশের একটি অন্যতম মাধ্যম হল ভিডিও। কিন্তু ভিডিও এডিটিং সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারনে আমাদের অনেক কিছুই অজানা রয়ে গেছে। আমাদের আজকের পোস্টে আমরা ভিডিও এডিটিং কি? কোথায় থেকে ভিডিও এডিটিং শিখবো? ভিডিও এডিটিং করার সফটওয়্যার (ফ্রী এবং পেইড), মার্কেটে ভিডিও এডিটিং এর ভ্যালু কেমন এবং ভবিষ্যৎ কি? ভিডিও এডিটিং করে কত টাকা আয় করা যায়? এগুলো সম্পর্কে জানবো। চলুন শুরু করা যাক।

ভিডিও এডিটিং কি?

ভিডিও এডিটিং একটি ক্রিয়েটিভ স্কিল, কোন ভিডিও কে গল্প এবং অনুভূতিতে রূপান্তরিত করার পদ্ধতি। সহজ কথায়, ভিডিও এডিটিং হচ্ছে গল্পের প্রয়োজনে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ সম্পাদন করে পূর্ণাঙ্গ গল্পে পরিণত করা। আমরা মুভিতে যে দৃশ্য গুলো দেখি সেগুলো আসলে ভিডিও এডিটিং এর পরের ফাইনাল কাট। ভিডিও এডিট করার স্কিল থাকলে আমরা কর্পোরেট জব থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং সব পর্যায়েই প্রায় কাজ করতে পারবো।

ভিডিও এডিটিং শেখার উপায়

ভিডিও এডিটিং অনেক বড় একটি সেক্টর যেখানে অনেক বিষয় আছে আপনাকে শুরু থেকে শিখতে হবে। এডিটিং সফটওয়্যার সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। যত বেশি ফিচার আপনি আয়ত্ত করতে পারবেন আপনার এডিটিং তত সুন্দর হবে। নিচে এমন কিছু মাধ্যম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে যেখানে ভিডিও এডিটিং শেখার সম্পূর্ণ গাইড দেওয়া আছে।

ইউটিউব কিভাবে তৈরি হলো? ইউটিউবারদের ভবিষ্যত কি?

Linda/লিন্ডা–  লিন্ডা একটি অনলাইন লার্নিং প্লাটফর্ম। লিন্ডা যে কোন টপিকের ওপর ব্যাসিক থেকে অ্যাডভান্স টিউটোরিয়াল ভিডিও পাবলিশ করে। এখানে আপনি কিছু টাকা খরচ করলে প্রফেশনাল এডিটরদের কাছ থেকে ভিডিও এডিটিং শিখতে পারবেন।

Udemy/ইউডেমি– ইউডেমি আরও একটি পপুলার টিউটোরিয়াল ওয়েবসাইট। এখানে আপনি ভিডিও এডিটিং নিয়ে প্রফেশনাল মানের অনেক ভিডিও টিউটোরিয়াল পাবেন। যদিও ইউডেমি থেকে কোর্স করতে চাইলে আপনাকে পে করতে হবে। কিন্তু কুপন কোড ইউজ করে অনেক পেইড কোর্স সহজে এনরোল করা যায়, তাছাড়া ফ্রিতেও অনেক ধরণের কোর্স আছে।

Training Center/ট্রেনিং সেন্টার– ট্রেনিং সেন্টার গুলোতে ভিডিও এডিটিং হাতে কলমে শেখার সুযোগ থাকে। এডিটিং করার সময় অনেক খুঁটিনাটি বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। বাসায় বসে অনলাইন ভিডিও দেখে অনেক সময় অনেক প্রশ্নের সমাধান পাওয়া যায় না। সে দিক থেকে ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে শেখা অনেক ভালো কাজে দেয়।

বাংলাদেশে এমন অনেক ট্রেনিং সেন্টার আছে যারা প্রফেশনাল মানের ভিডিও এডিটিং শেখায়, এর সাথে সাথে সরাসরি মেন্টরিং করে, যা শেখার গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু অবশ্যই ট্রেনিং সেন্টারে শেখার আগে উক্ত ট্রেনিং সেন্টার সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ খবর নিয়ে যাচাই করে নিবেন, কেননা বাংলাদেশের অধিকাংশই ট্রেনিং সেন্টারই এখন ভূয়া হয়ে থাকে।

Adobe Tutorial/অ্যাডোবি টিউটোরিয়াল– অ্যাডোবি তাদের ওয়েবসাইটে ভিডিও এডিটিং নিয়ে বিগিনার এবং এক্সপেরিয়েন্স দুই ক্যাটাগরির অনেকগুলো টিউটোরিয়াল রেখেছে। আপনি এখানে প্রিমিয়ার প্রো এবং আফটার ইফেক্ট এর অনেক অ্যাডভান্স লেভেলের ভিডিও পাবেন।  

Practice/প্র্যাকটিস– একটা প্রবাদ তো জানেন যে “প্র্যাকটিস মেকস অ্যা ম্যান পারফেক্ট”। এখানে “প্র্যাকটিস মেকস ইয়োর স্কিল পারফেক্ট”। যা শিখবেন তা যদি প্র্যাকটিস না করেন তাহলে ভুলে যাবেন। আর এডিটিং থেকে শুরু করে সকল ক্রিয়েটিভ কাজের সফলতা নির্ভর করে বেশি বেশি প্র্যাকটিসের উপর।

বিশ্বসেরা কয়েকজন হ্যাকারের জীবনি

এই প্ল্যাটফর্মগুলোর পাশাপাশি ইউটিউব গুগল তো রয়েছেই যেখানে আপনি অংসখ্যা রিসোর্স পেয়ে যাবেন ফ্রিতেই।

ভিডিও এডিটিং করার বেস্ট সফটওয়্যার (ফ্রী এবং পেইড)

ভিডিও এডিটিং শেখার জন্য আপনি ফ্রী ভিডিও এডিটর বা পেইড ভিডিও এডিটর দুটোই ব্যবহার করতে পারবেন। তবে প্রফেশনাল ভিডিও এডিটিং করার জন্য পেইড ভিডিও এডিটর শেখার চেষ্টা করা উচিৎ। নিচে আপনাদের সুবিধার জন্য কিছু ফ্রী এবং পেইড এডিটর সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে।

ফ্রী এডিটর

OpenShot/ওপেনশট

ওপেনশট একটি ফ্রী এবং ওপেন সোর্স সফটওয়্যার। ফ্রী ভিডিও এডিটিং এর জন্য ওপেনশট সব থেকে সেরা। ক্রস প্লাটফর্ম সাপোর্ট সাথে পাওয়ারফুল অ্যানিমেশন এবং বিভিন্ন ইফেক্ট দিয়ে সাজানো এই সফটওয়্যার অন্যান্যদের থেকে আলাদা।

HitFilm Express/হিটফিল্ম এক্সপ্রেস

প্রফেশনাল ভিডিও এডিটিং করতে হিটফিল্ম এক্সপ্রেস একটি আদর্শ এডিটর। এখানে 2D, 3D, ৪০০+ ভিডিও ইফেক্ট, টেক্সট, টাইটেল, ভিডিও কাটিং, অডিও এডিটিং থেকে শুরু করে অনেক ফিচার ফ্রীতে পাওয়া যায়। গ্রীনস্ক্রীন ব্যাবহার করে ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভ করার মতো প্রিমিয়াম ফিচার ফ্রী ব্যবহার করা যায়। হিটফিল্ম এক্সপ্রেস অনেক প্রফেশনাল ইউটিউবার ইউজ করে।

Shotcut/শটকাট

শটকাট একটি ওপেন সোর্স ক্রস প্লাটফর্ম ভিডিও এডিটর। ভিডিও ট্রিমিং, এডিটিং, ক্রপিং, স্ক্রীন রেকর্ডিং থেকে শুরু করে মোটামুটি ধরনের কাজ সহজেই করা যায়। ইউজার ইন্টারফেস খুব সহজে মনে রাখা যায়।

পেইড এডিটর

Adobe Premier Pro CC/অ্যাডোবি প্রিমিয়ার প্রো সিসি

প্রফেশনাল ভিডিও এডিট করতে অ্যাডোবি প্রিমিয়ার প্রো সিসি এর কোন জুড়ি নেই। ক্রিয়েটিভ ক্লাউডের অধিনে থাকা এই এডিটরের স্টক অডিও এবং ভিডিও লাইব্রেরী অনেক বড়। ৩০৬ ডিগ্রি, ৪ কে, এইচডিআর ভিডিও সাপোর্ট থেকে একটা প্রফেশনাল ভিডিও তৈরি করতে যা লাগে সব এখানে পাবেন।

ভিডিও এবং অডিও ইফেক্ট, ভিডিও ট্রানজিশন, এডজাস্টমেন্ট লেয়ারস, রিয়েল টাইম রেন্ডার সহ আরও অনেক অনেক ফিচার আছে অ্যাডোবি প্রিমিয়ার প্রো সিসি তে। আপনি চাইলে ৭ দিনের ট্রায়াল ব্যবহার করতে পারবেন অথবা মাসিক ২০.৯৯ ডলার খরচ করতে হবে।

Vegas Pro/ভেগাস প্রো

এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ভিডিও এডিটর, অনেক হলিউড মুভিতে ভেগাস প্রো ব্যবহার করা হয়। বিল্ডইন ভিজুয়াল ইফেক্ট ফিচার থাকায় আলাদা সফটওয়্যার দরকার পরে না। এছারাও মোশন ট্রাকিং, ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও এডিট, মাল্টি-ক্যাম এডিটিং, অটো সাবটাইটেল ক্রিয়েশন, এফএক্স মাস্কিং সহ অনেক ফিচার আছে ভেগাস প্রো এডিটরে।

বর্তমানে ভেগাস প্রো ১৮ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং এইচডিআর কালার গ্রেডিং ইউজ করে ভিডিও এডিট করার সুবিধা দিচ্ছে। ভেগাস প্রো ৭ দিনের ফ্রী ট্রায়াল ব্যবহার করে দেখতে পারেন অথবা ৪৭৯ ডলার দিয়ে কিনে ব্যবহার করতে পারবেন। দাম বেশি হলেও ভেগাস প্রো একটি কমপ্লিট ভিডিও এডিটর।

Camtasia Studio/ক্যামটাসিয়া স্টুডিও

টেকস্মিথের ক্যামটাসিয়া ভিডিও এডিটর এবং স্ক্রীন রেকর্ডার সফটওয়্যার অনেক জনপ্রিয়। বিশেষ করে যারা টিউটোরিয়াল ভিডিও বানায় তাদের জন্য ক্যামটাসিয়া বেস্ট অপশন। টিউটোরিয়াল ভিডিও তৈরি করার জন্য যত ধরনের টুল বা ফিচার প্রয়োজন সবকিছু ক্যামটাসিয়া সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা আছে। ক্যামটাসিয়া আপনি ৭ দিনের ট্রায়াল হিসেবে ইউজ করে দেখতে পারবেন। এছারাও ২৪৯.৯৯ ডলার ওয়ান টাইম ফি দিয়ে কিনে ব্যবহার করতে পারবেন।

Wondershare Filmora/ওয়ান্ডারশেয়ার ফিলমোরা

পার্সোনাল কম্পিউটারে ইউজ করার জন্য ফিলমোরা বেস্ট চয়েস। ভিডিও এডিটর হিসেবে এটি অনেক লাইটওয়েট এবং কম রিসোর্স খরচ করে। প্রফেশনাল মানের যে কোন ভিডিও যেমন মুভি, শর্টফিল্ম, মিউজিক ভিডিও, ৪কে ইত্যাদি ভিডিও এডিট করা যায়। এছারাও মাল্টি-ক্যাম এডিটিং, গ্রীনস্ক্রীন, টিল্ট স্ক্রীন,স্প্লিট, স্ক্রীন রেকর্ডার, অডিও মিক্সার সহ অনেক অ্যাডভানস ফিচার ফিলমোরায় পাওয়া যায়। ৭ দিনের ফ্রী ট্রায়াল বাদেও ৬৯.৯৯ ডলার ওয়ান টাইম ফি দিয়ে ওয়ান্ডারশেয়ার ফিলমোরা ব্যবহার করতে পারবেন।

মার্কেটে ভিডিও এডিটিং এর ভ্যালু কেমন এবং ভবিষ্যৎ কি?

আপনি একজন প্রফেশনাল ভিডিও এডিটর হতে পারলে কাজ নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। কারন দেশের ডিজিটাল মিডিয়ায় দক্ষ ভিডিও এডিটরের চাহিদা দিন দিন বাড়ছেই। এছাড়া আপনি দেশের বাইরে অনেক অনেক টিভি চ্যানেল আছে যেখানে কাজ করতে পারবেন। প্রোডাকশন বিজনেসে দক্ষ ভিডিও এডিটরের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বেড়ে চলেছে। নাটক বা মুভি এডিটর হিসেবে কখনই আপনার কাজের অভাব হবে না। আপনি একজন ট্রেইনার হিসেবে কাজ করতে পারবেন। অন্যদিকে মার্কেটপ্লেসে অ্যাকাউন্ট খুলে সার্ভিস সেল দিতে পারবেন।

ভিডিও এডিটিং করে কত টাকা আয় করা যায়?

ভিডিও এডিটিং অনেক দামী আর কুল প্রফেশন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আপনি শুরুর দিকে ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেতন পাবেন, আপনার পারফর্মেন্সের উপর নির্ভর করে ধীরে ধীরে বেতন বাড়তে থাকবে।

অনলাইন ইনকাম কি? অনলাইন ইনকাম করার উপায়

এছাড়া আপনি অনলাইন মার্কেটপ্লেসে সার্ভিস সেল দিতে পারবেন। ফাইভারে ভিডিও এডিটিং নিয়ে অনেক গিগ পাবেন। সে গিগ গুলোর সেল দেখলেই আপনি বুজতে পারবেন আসলে এই সেক্টর কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া আপওয়ার্কে প্রতিদিন অনেক জব পোস্ট হয় ভিডিও এডিটিং নিয়ে। আপনি সেখানে কাজে বিড করে অনেক ভালো একটা এমাউন্ট জেনারেট করতে পারবেন।

আজকাল ইউটিউব অনেক পপুলার একটি অনলাইন ইনকাম সোর্স। আপনার ভিডিও এডিটিং স্কিল কাজে লাগিয়ে সুন্দর সুন্দর ভিডিও তৈরি করে অ্যাডসেন্স থেকে ইনকাম করতে পারবেন। ভিডিও এডিটিং একটি এভারগ্রীন স্কিল সেক্টর। এখানে কাজ শিখে আপনাকে বসে থাকতে হবে না। প্রতি মাসে ভিডিও এডিটিং করে অনেক ভালো মানের একটি ইনকাম জেনারেট করতে পারবেন। আজকের লেখায় আমরা ভিডিও এডিটিং নিয়ে অনেক তথ্য জানলাম। আশাকরি আমাদের লেখা আপনার ভালো লেগেছে। কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না ধন্যবাদ।

Leave a Reply