অনলাইনে ইনকাম করার উপায়

অনলাইন ইনকাম কি? অনলাইনে ইনকাম করার উপায়

করোনা কালে আমরা জীবনযাপন সম্পর্কে অনেক নতুন বিষয় শিখেছি। ঘরে বসে যে অফিস করা যায় তা আমরা আগে কখনো ভেবে দেখিনি। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের ঘরে বসে অফিস সহ পড়ালেখা থেকে শুরু করে সকল কাজ করা শিখিয়েছে। আর এই সব কিছু সম্ভব হয়েছে ইন্টারনেটের কারণে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে আমরা ঘরে বসে অফিসে ভার্চুয়ালি কাজ করতে পারছি। আমাদের লেখাপড়া করার জন্য বাইরে যেতে হচ্ছে না। এমনকি অনলাইনে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে আমরা ইনকাম করতে পারছি। আমাদের আজকের লেখায় অনলাইন ইনকাম কি? অনলাইন ইনকাম কতো প্রকার? এবং এর উপায় সম্পর্কে জানবো। আশা করি একদম শেষ পর্যন্ত থাকবেন।

অনলাইন ইনকাম কি?

ইন্টারনেট কে কাজে লাগিয়ে নিজের মেধা দিয়ে ইনাকাম করা কে অনলাইন ইনকাম বলে। সহজভাবে বলতে গেলে আপনার স্কিল অনলাইনে বিভিন্ন বায়ারের কাছে বিক্রি করে বা কনটেন্ট তৈরি করে ইনকাম করতে পারবেন। আমরা আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে অনেক শুনেছি বা জেনেছি।অনলাইন ইমকাম নিয়ে অনেক অনেক মিথ প্রচলিত আছে। এদের মধ্যে বেশীরভাগ মিথ্যা বা বানোয়াট, কিছু স্বার্থবাদী মানুষ কখনোই চায় না অন্য কেউ সফল হোক। যাইহোক, অনলাইন ইনকাম যদিও সহজ কোন বিষয় না তবে ধৈর্য, মেধা, সময় এবং ইচ্ছা শক্তি থাকলে খুব সহজেই অনলাইন ইনকাম করা সম্ভব।

অনলাইন ইনকাম কতো প্রকার?

অনলাইন ইনকাম একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। যতদিন পর্যন্ত ইন্টারনেট আছে ততদিন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া সচল থাকবে, আর ভবিষ্যৎ দুনিয়া যেহেতু ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তির দুনিয়া তাই এই সম্ভাবনা সারাজীবন বেড়েই চলবে।

অনলাইন ইনকাম সাধারণত দুই প্রকার

1.       অ্যাক্টিভ ইনকাম

2.       প্যাসিভ ইনকাম

অ্যাক্টিভ ইনকাম- অ্যাক্টিভ ইনকাম বা সক্রিয় ইনকাম যা প্রচলিত ধারায় আমরা চাকরী নামে জানি। অ্যাক্টিভ ইনকাম এমন একটি বিষয় যা আপনাকে সময়ের ওপর বেতন দেয়। অর্থাৎ ধরুন আপনি একটি দোকানে কাজ করেন। সেখানে আপনাকে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা সময় দিতে হয়, এর মধ্যে আপনি কোন দিন ছুটি নিলে আপনার বেতন থেকে সে টাকা কেটে নেওয়া হয়। মানে হলো আপনি যতক্ষণ কাজ করবেন ততক্ষণ বেতন পাবেন কিন্তু যতক্ষণ করবেন না ততক্ষণ বেতন পাবেন না।

বিষয়টা অনেকটা দিনমজুর এর মতো। এরকম ব্যবস্থা যেমন অফলাইনে আছে তেমনি অনলাইনে আছে। অনলাইন মার্কেটপ্লেসে এমন অনেক কাজ আছে যা অ্যাক্টিভ ইনকামের মধ্যে পরে। যেমন- কন্টেন্ট রাইটিং বা গ্রাফিক্স ডিজাইন এর কাজ। এই কাজ গুলো করার জন্য আপনাকে প্রতিনিয়ত মাথা খাটাতে হবে এবং সময় ও পরিশ্রম দিতে হবে। অর্থাৎ আপনাকে সবসময় অ্যাক্টিভ থাকতে হবে।

প্যাসিভ ইনকাম- প্যাসিভ ইনকাম অনেক পপুলার এবং বিস্তৃত একটি ব্যবস্থা। অনলাইন আক্টিভিস্ট রা এটাকে প্লান বি হিসেবে রাখে। তারা ফ্রীলান্সিং এর পাশাপাশি প্যাসিভ ইনকামে ইনভেস্ট করে। প্যাসিভ ইনকাম সাধারণত এমন একটি সিস্টেম যেখানে আপনাকে শুরুর দিকে মেধা, টাকা এবং সময় ইনভেস্ট করতে হয়। যেখান থেকে নিয়মিত ইনকাম আসতে থাকে এবং এখানে আপনাকে সবসময় কাজ করতে হয়না। যেমন শেয়ার মার্কেটের কথাই ধরুন, সেখানে আপনি মার্কেট যাচাই বাছাই করে শেয়ার কেনার পর বসে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ নেই।

এখন আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে কখন আপনার শেয়ারের দাম বাড়বে এবং আপনি তা বিক্রি করতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে আপনার শেয়ারের দাম পরের বছর বাড়তে পারে, তাহলে আপনাকে অবশ্যই পরের বছরের অপেক্ষা করতে হবে। এই পুরো সময়ের মাঝে আপনাকে আর তেমন কিছুই করতে হবে না, এই সময়টুকু আপনি অন্য কোন জায়গায় ইনভেস্ট করতে পারবেন। অথবা আপনি কোন ট্র্যাডিশনাল চাকরির পাশাপাশি প্যাসিভ ইনকাম করা যায় এমন জায়গায় ইনভেস্ট করতে পারবেন।  

অনলাইনে ইনকাম করার উপায়

আমরা ইতিমধ্যে অনলাইন ইনকাম কতো প্রকার এবং কি কি তা জানলাম। এবার চলুন কীভাবে অনলাইনে ইনকাম করা যায় সে ব্যাপারে জানবো।

ইউটিউব- ইউটিউব একটি ভিডিও শেয়ারিং ওয়েবসাইট যা গুগল ২০০৬ সালে কিনে নেয়। বর্তমানে ইউটিউব পৃথিবীর সব থেকে বড় ভিডিও শেয়ারিং প্লাটফর্ম। ইউটিউবে মনিটাইজেশন নামে একটি প্রক্রিয়া আছে যা ভিডিও আপলোডারদের ভিডিও ক্রিয়েট ও পাবলিশ করার জন্য টাকা দিয়ে থাকে।

ইউটিউব থেকে ইনকাম করতে চাইলে আপনাকে একটি চ্যানেল তৈরি করতে হবে। সে চ্যানেলে ভিডিও আপলোড করতে হবে এবং অনেক অনেক ভিউজ পেতে হবে। ইউটিউব তাদের চ্যানেল মনিটাইজেশন রুলস হিসেবে কিছু বাঁধাধরা নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। কোন চ্যানেল মনিটাইজেশন পেতে হলে তাকে এক বছরের মধ্যে ৪০০০ মিনিট ওয়াচটাইম এবং ১০০০ সাবস্ক্রাইবার পেতে হবে।

আপাত দৃষ্টিতে অনেক কঠিন মনে হলেও সঠিক পথে পরিশ্রম এবং ইউনিক কন্টেন্ট তৈরি করলে খুব সহজেই মনিটাইজেশন পাওয়া যায়। ইউটিউব মনিটাইজেশন  নিয়ে আমাদের বিস্তারিত পোস্ট সামনে আসছে।

অ্যাডসেন্স- অ্যাডসেন্স গুগলের একটি সার্ভিস যা সারা দুনিয়ায় অনলাইন ইনকাম হিসেবে অনেক পরিচিত। অ্যাডসেন্স এক্সপার্ট মার্কেটার বা এস ই ও স্পেশালিষ্ট দের কাছে স্মার্ট ইনকামের একটি রাস্তা। অ্যাডসেন্স সাধারণত একটি অনলাইন অ্যাড সার্ভিস যারা বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা কন্টেন্টে অ্যাড দেখায়।

অ্যাডসেন্স ব্যবহার করার জন্য আপনাকে ওয়েবসাইট বানাতে হবে এরপর উক্ত ওয়েবসাইটের কনটেন্ট গুগল এ রাঙ্ক করাতে হবে, কারন এর মাধ্যমেই ওয়েবসাইটে ভিজিটর আসবে। যত বেশি ভিজিটর আসবে ততোবেশি  অ্যাড এ ক্লিক পরবে। যত বেশি অ্যাড এ ক্লিক পরবে বা ইম্প্রেশন বাড়বে ততোবেশি ইনকাম হবে।অ্যাডসেন্স এর জন্য এস ই ও খুব জরুরী একটি বিষয়।

ফ্রিল্যান্সিং- যুব সমাজের কাছে ফ্রিল্যান্সিং শব্দটি খুব জনপ্রিয়। এত জনপ্রিয় হওয়ার পিছনে “ঘরে বসে ইনকাম” নামক একটি লাইনের কৃতিত্ব আছে। ফ্রিল্যান্সিং অর্থ মুক্ত পেশা অর্থাৎ এখানে আপনার বস আপনি নিজেই, যখন ইচ্ছা কাজ করবেন আর যখন ইচ্ছা ঘুরে বেড়াবেন। যদিও শুনতে অনেক ভালো আর এক্সসাইটিং লাগে কিন্তু বাস্তবতা একটু কঠিন।

সহজে আর যাই করা যাক না কেন ইনকাম করা যায়না, এর জন্য অনেক সময় এবং মেধা খরচ করতে হয়। অনেক বেশি ধৈর্য্য ধারন করতে হয় না হলে উত্থান পতনে হারিয়ে যেতে হয়। ফ্রিল্যান্সিং মুক্ত পেশা হওয়ার কারণে হাজার হাজার মানুষ এই পেশায় ঝুঁকে পরেছে।

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং- অনলাইনে কোন পণ্য বিক্রি করে দিয়ে কিছু অংশ কমিশন হিসেবে রাখা কে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বলে।এটি পাসিভ ইনকামের অনেক বড় একটি উধারন। অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং একটি উচ্চ মানের ব্যবসা যা দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। আজকে অ্যামাজন পৃথিবীর সব থেকে বড় ইকমার্স প্লাটফর্ম হওয়ার পিছনে এই অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার দের অবদান সব থেকে বেশি। কোন ওয়েবসাইট বা ইউটিউবের কোন ভিডিও এর মাধ্যমে অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা বিক্রি করে সহজেই অনেক ভালো মানের আমাউন্ট ইনকাম করা সম্ভব।

মার্কেটপ্লেসে কাজ-  আমরা ফাইবার বা আপওয়ার্ক এর নাম শুনেছি। এই দুটো অনলাইন মার্কেটপ্লেস যেখানে বায়াররা তাদের কাজ করিয়ে নিতে কর্মী খুঁজে। মার্কেটপ্লেসের সুবিধা হলো এখানে ক্যাটাগরি হিসেবে সবকিছু গোছানো থাকে। এখানে আপনি আপনার ইচ্ছা মতো ক্যাটাগরি অনুযায়ী কাজ করতে পারবেন।

ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট- অনলাইন ইনকামের অনেক গুলো রাস্তার মধ্যে ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা ভিএ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই ধরণের কাজগুলো সহজ হয়ে থাকে যা ক্লায়েন্টের করার সময় নেই। অর্থাৎ ক্লায়েন্টের  কাজ আপনাকে তার হয়ে করে দিতে হবে। এই কাজে সাধারণত আপনাকে ক্লায়েন্টের সোশ্যাল আক্টিভিটি, ক্রেডিট কার্ড ম্যানেজ করা থেকে শুরু করে অনেক ধরণের কাজই করতে হবে।বর্তমান সময়ে ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট অনেক ভালমানের একটি অনলাইন ইনকাম ব্যবস্থা।

ডাটা এন্ট্রি- অনলাইন ইনকামের সব থেকে সহজ কাজ হলো ডাটা এন্ট্রির কাজ। এই কাজ সহজ হওয়ায় মার্কেটে এর কম্পিটিশন অনেক অনেক বেশি। নতুন হিসেবে এই সেক্টর এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

ওয়েব ডিজাইন এবং ডেভেলোপমেন্ট- অনলাইন ইনকামের যতগুলো দামী কাজ আছে ওয়েব ডিজাইন এবং ডেভেলোপমেন্ট তার মধ্যে অন্যতম। প্রতি মিনিতে ৩৮০ টি নতুন ওয়েবসাইট তৈরি হয় পুরো পৃথিবীজুড়ে। তাহলে এখন আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখুন কি পরিমান চাহিদা আছে এই কাজে।

ওয়েব ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট এর কাজে কম দক্ষ মানুষ থাকার কারনে ভালো অবস্থান তৈরি করা সহজ। কিন্তু এর জন্য আপনাকে দক্ষ হয়ে কাজে নামতে হবে, মনে রাখবেন ওয়েব ডিজাইন এবং ডেভেলোপমেন্ট একটি হাই ক্লাস জব। এখানে “শিখিয়ে দিলে পারবো” এই কথার কোন দাম নেই।

কনটেন্ট রাইটিং- লেখালিখি করে যে ইনকাম করা যায় তা অনেকের কাছে অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলেও এটাই বাস্তব। অ্যামাজন প্রোডাক্ট এর রিভিউ বা ইনফরমেটিভ আর্টিকেল বর্তমান মার্কেটে অনেক ভালো মূল্য পায়। এছারাও কপিরাইটিং বা সেলসপেজ রাইটিং সব থেকে বেশি মূল্যের কন্টেন্ট রাইটিং জব। 

গ্রাফিক্স ডিজাইন- অনলাইন মার্কেটে গ্রাফিক্স ডিজাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। এটি একটি ইনফিনিট জব সেক্টর যার কাজ সারাজীবন থাকবে। গ্রাফিক্স ডিজাইনকে এভারগ্রীন জব সেক্টর বললে ভুল হবে না। সাধারণত লোগো ডিজাইন, ফ্লেয়ার ডিজাইন, বিজনেস কার্ড ডিজাইন, পোষ্টার ডিজাইন, ওয়েবসাইট এর পিএসডি ডিজাইন, ফটো ম্যানুপুলেশন সহ আরও অনেক কাজ গ্রাফিক্স ডিজাইনের মধ্যে পরে।আপনি ফটোশপ এবং ইলাস্ট্রেটর শিখলে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে কাজ শুরু করতে পারবেন। 

অনলাইন ইনকামের সতর্কতা

অনলাইন ইনকাম যেমন একটি মুক্ত পেশা তেমনি সহজে শেখা যায়। তরুণ-তরুণী দের মাঝে হ্যাকিং নিয়ে যেমন কৌতূহল কাজ করে তেমন অনলাইন ইনকাম নিয়েও কাজ করে। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ তাদের নিজেদের পকেট ভারী করে।

অনলাইন ইনকাম শেখার জন্য আপনাকে অন্য কারো কাছে না গেলেও চলবে। অনলাইনে হাজার হাজার ব্লগ এবং ভিডিও রয়েছে যেখান থেকে আপনি ফ্রীতেই শিখতে পারবেন। অনলাইন ইনকাম শেখার জন্য কি কি করতে হবে তা পরের পোস্টে বিস্তারিত বলে দিয়েছি। ফ্রী এবং পেইড যত রিসোর্স আছে তা লিস্ট আকারে দিয়ে দিয়েছি যাতে এটিকে আপনারা একটি গাইডলাইন হিসেবে ফলো করতে পারেন।কোন চটকদার অ্যাড দেখে আপনার কষ্টের টাকা নষ্ট করবেন না। টাকা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার আপনার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করবে।

পরিশেষে বলতে চাই অনলাইন ইনকাম এখন একটি পপুলার এবং উপযুক্ত পেশা। নিয়মিত সময়, মেধা আর ধৈর্য দিয়ে চেষ্টা করলে সফলতা খুব দ্রুত ধরা দেয়। আজকের পোস্টে আমরা অনলাইন ইনকাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলাম। কি কি কাজ অনলাইন ইনকামের মধ্যে পরে এবং এগুলোর ভবিষ্যৎ কি সে সম্পর্কে জানলাম। আশা করি পুরো পোস্ট পরে অনলাইন ইনকাম সম্পর্কে আপনার মনের মধ্যে থাকা সব প্রশ্নের সমাধান হয়েছে ধন্যবাদ। 

Leave a Reply