মাইক্রোসফট কিভাবে তৈরি হলো?

মাইক্রোসফট কিভাবে তৈরি হলো? মাইক্রোসফটের অজানা ইতিহাস

প্রযুক্তির দুনিয়ায় কম্পিউটার একটি আদর্শ ডিভাইস। কম্পিউটার তৈরির পর থেকে প্রযুক্তির দুনিয়ার অনেক উন্নতি হয়েছে। নতুন নতুন ডিভাইস তৈরি হয়েছে যা প্রতিদিন আমরা ব্যবহার করছি। প্রযুক্তির বিকাশ এখন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে ছড়িয়ে গিয়েছে। সবই সম্ভব হয়েছে কম্পিউটারের উন্নতির কারনে।

কম্পিউটার এবং প্রযুক্তি গোটা বিশ্বে তৈরি করেছে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান। যে সব প্রতিষ্ঠান কম্পিউটারকে টার্গেট করে পণ্য বানাচ্ছে এবং বিক্রি করছে তারা শেয়ার বাজারে রাজ করছে। আমাদের আজকের আয়োজনে আমরা আলোচনা করবো মাইক্রোসফট নামক একটি সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিয়ে। পুরো আলোচনা জুড়ে থাকবে মাইক্রোসফট কিভাবে তৈরি হলো? মাইক্রোসফটের অজানা ইতিহাস এবং এর বিবর্তন সম্পর্কে। তো চলুন আলোচনা শুরু করা যাক।

মাইক্রোসফট কিভাবে তৈরি হলো?

মাইক্রোসফট তৈরি হওয়ার পিছনের গল্প খুবই ইন্টারেস্টিং। মাইক্রো-কম্পিউটার সফটওয়্যার থেকে মাইক্রোসফট নামের উৎপত্তি। প্রতিষ্ঠাকালে এর সদর দপ্তর ছিল নিউ ম্যাক্সিকোর আলবুকুয়ের্ক শহরে এবং বর্তমান সদর দপ্তর রেডমন্ড, ওয়াশিংটন।

মাইক্রোসফটের নির্মাতা পল অ্যালেন এবং বিল গেটস দুজনে বন্ধু ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তারা নিজেদের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এ পারদর্শী করে তোলেন। সে সময় কম্পিউটার ছিল একটি দামী পণ্য যা কেনার এবং ব্যবহার করার সামর্থ্য সবার ছিলনা। কিন্তু প্রোগ্রামিং করার জন্য তাদের কম্পিউটার প্রয়োজনীয় হয়ে পরে। সে সময় কম্পিউটার সেন্টার কর্পোরেশন নামক একটি প্রতিষ্ঠানে ঘণ্টায় ৪০ ডলার দিয়ে কম্পিউটার ব্যবহার করার অ্যাক্সেস দিত। কিন্তু স্টুডেন্ট অবস্থায় এই অর্থ যোগান দেওয়া ছিল অসম্ভব। তাই অ্যালেন এবং গেটস তাদের আরও কিছু প্রোগ্রামার বন্ধুদের নিয়ে চুপি চুপি কম্পিউটার সেন্টার কর্পোরেশনের প্রোগ্রামের বাগ খোঁজা শুরু করে। 

তারা এই কাজ খুব আনন্দের সাথে করতে থাকে কিন্তু কম্পিউটার সেন্টার কর্পোরেশন তা টের পেয়ে যায় এবং তাদের মধ্য থেকে চার জন কে অ্যাক্সেস ব্যান করে দেয়। এই চারজনের মধ্যে অ্যালেন এবং গেটস দুজনেই ছিল। এ ঘটনার পর তারা বাকী বন্ধুদের নিয়ে একটি কম্পিউটার ক্লাব তৈরি করে এবং যার নাম ছিল কম্পিউটার অ্যান্ড প্রোগ্রামিং ক্লাব। 

এই ক্লাবের প্রধান কাজ ছিল কোন কোম্পানির কম্পিউটার সিস্টেমের বাগ খুঁজে বের করা। আশ্চর্যজনকভাবে তাদের প্রথম কাস্টমার ছিল কম্পিউটার সেন্টার কর্পোরেশন, যারা কিনা এর আগের বছর তাদের কম্পিউটার অ্যাক্সেস করা ব্যান করে দিয়েছিল।

এর কিছু বছর পর অ্যালেন এবং গেটস একটি সিস্টেম তৈরি করে যা র (RAW) ডাটাকে সহজ ভাবে পড়ার উপযোগী করে তোলে। এই সিস্টেম তৈরি করতে তারা ব্যবহার করেছিল ইন্টেলের একটি প্রসেসর। তারা এই সিস্টেম বিক্রি করা শুরু করেন এবং মোটামুটি প্রফিট করলেও তারা তা বন্ধ করে দেয়। এর পেছনে অবশ্য একটা কারণ ছিল।

১৯৭৪ সালে অ্যালেন এবং গেটস আলাদা আলাদা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। পল অ্যালেন চলে যায় ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এবং বিল গেটস চলে যায় হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে। সেসময় আল্টিয়ার ৮৮০০ নামক একটি মাইক্রো-কম্পিউটার বাজারে আসে। পপুলার ম্যাগাজিন নামক একটি ম্যাগাজিনে এই কভার দেখে অ্যালেন চলে যায় হার্ভার্ডে এবং তা গেটসকে দেখায়। এবং তখনি তারা সিদ্ধান্ত নেয় মাইক্রো-কম্পিউটারের জন্য তারা প্রোগ্রাম তৈরি করবে যা এর ব্যবহার আরও সহজ করে দেবে। 

তাদের দুজনের সিধান্তেই পল অ্যালেন চলে যান আল্টিয়ার ৮৮০০ কম্পিউটার নির্মাতা এমআইটিএসের অফিসে। এবং সেখানে প্রস্তাব রাখেন যে তারা এই মাইক্রো-কম্পিউটারের জন্য প্রোগ্রাম তৈরি করবে। যদিও তারা কি প্রোগ্রাম তৈরি করবে সে সিধান্ত নেয়নি কিন্তু তাদের প্রোগ্রাম তৈরির প্রস্তাব এমআইটিএসের পছন্দ হয়ে যায়। 

পরে গেটস একটি ইন্টারপ্রিটার (যা কোডে লেখা ইন্সট্রাকশন প্রদর্শিত করতে সাহায্য করে) তৈরি করে এবং অ্যালেন এর জন্য একটি সিমুলেটর তৈরি করে। পুরো টেস্ট করার আগেই তাদের এই প্রোডাক্ট এমআইটির কাছে প্রদর্শন করার ডাক চলে আসে। তারা প্রথম এমআইটিএসের কম্পিউটারে এই প্রোগ্রাম টেস্ট করে এবং এটি সকল টেস্টেই পাস করে যায়। 

তারা এই প্রোগ্রামের নাম দেয় আল্টারায় বেসিক এবং এর মাধ্যমেই কম্পিউটারে থার্ড পার্টি প্রোগ্রামের প্রচলন শুরু হয়। এই প্রোগ্রাম তৈরির মাধ্যমে তারা দুজন বুজতে পারে যে ভবিষ্যতে এরকম প্রোগ্রাম অনেক জনপ্রিয়তা পাবে। তাই তারা মাইক্রোসফট নামক কোম্পানি তৈরি এবং রেজিস্ট্রেশন করে নেয়। 

১৯৯০ সালের মধ্যেই মাইক্রোসফট আয়ের দিক থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়। এর পরেই তারা সারা দেয় আইবিএম এর প্রকাশ করা অপারেটিং সিস্টেম তৈরির ডাকে। তারা আইবিএমকে অফার করে তারা অন্য কোম্পানির থেকে কম দাম রাখবে এবং এই অপারেটিং সিস্টেমের প্রতি কপি বিক্রিতে মাত্র ১ ডলার করে মাইক্রোসফটকে দিতে হবে। ইতিহাসে এই চুক্তিকে সবথেকে সফল এবং লাভজনক চুক্তি বলা হয়। এবং এভাবেই ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল মাইক্রোসফট কোম্পানি তৈরি হয়।

মাইক্রোসফটের অজানা ইতিহাস

যখন বিল গেটস আইবিএমের সাথে চুক্তি করে তখন পর্যন্ত তাদের হাতে কোন অপারেটিং সিস্টেম ছিল না। তখন তারা চিন্তা করে কোন কোম্পানির কাছ থেকে অপারেটিং সিস্টেম কিনে তারা আইবিএমকে দিবে। তো তারা ৭৫ হাজার ডলারে সিয়্যাটল কম্পিউটার প্রোডাক্টস নামক একটি কোম্পানি থেকে 86-DOS নামক একটি অপারেটিং সিস্টেম কিনে নেয় এবং MS-DOS নাম দেয়। 

আইবিএমের কাছে ৫০ হাজার ডলারে বিক্রি করে এবং শর্ত দেয় যে এই অপারেটিং সিস্টেমের স্বত্বাধিকার থাকবে মাইক্রোসফটের এবং সাইনিং রেজিস্ট্রেশন থাকবে আইবিএমের। এর পাশাপাশি মাইক্রোসফট এই একই অপারেটিং সিস্টেম বিক্রি করে আরও ৭০ টি কম্পিউটার কোম্পানির সাথে। যা একটি অন্যরকম ব্যবসার কৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়।

যখন MS-DOS অপারেটিং সিস্টেম ১ মিলিয়নের বেশি ইন্সটলের মাইলফলক স্পর্শ করে তখন শারীরিক সমস্যার কারনে অ্যালেন কোম্পানি থেকে অবসর নেয়। এর পর মাইক্রোসফটের সামনে একটি সমস্যা চলে আসে আর তা হলো তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি অ্যাপল ইতোমধ্যে গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস সম্বলিত অপারেটিং সিস্টেম বাজারে আনে। 

বিশ্বব্যাপী এই অপারেটিং সিস্টেম সমাদৃত হতে থাকে যা মাইক্রোসফটের ব্যবসার জন্য অনুকূল ছিল না। তাই গেটস সিধান্ত নেয় তাদের নিজস্ব ওয়ার্ড প্রসেসর, স্প্রেডশিট এবং গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস সম্বলিত অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ তৈরি করার। কিন্তু কোন ভাবেই যখন সম্ভব হচ্ছিল না তখন তিনি কৌশলে অ্যাপল থেকে গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেসের সোর্স বের করে আনেন। এতে অবশ্য স্টিভ জবস এবং বিল গেটস এর মধ্যকার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। তবে ব্যবসার খাতিরে তো মানুষকে কতো কিছুই করতে হয়।

মাইক্রোসফট যখন ১৯৮৬ সালে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হয় তখন তারা শেয়ার বাজার থেকে ForeThought নামক একটি কোম্পানি কিনে নেয়। যা সাধারণত পাওয়ারপয়েন্ট নামক একটি সফটওয়্যার তৈরি করে বিখ্যাত হয়। এই কোম্পানি কিনে নেওয়ার পর মাইক্রোসফট তাদের তৈরি ওয়ার্ড, এক্সেল, আউটলূক এবং পাওয়ারপয়েন্ট নিয়ে মাইক্রোসফট অফিস নামে একটি সফটওয়্যার তৈরি করে। এবং একে ক্রস প্লাটফর্ম হিসেবে বাজারজাত করে।

প্রতিবছর একটি করে নতুন এবং উন্নত অপারেটিং সিস্টেম একের পর এক বাজারে আনতে থাকে মাইক্রোসফট। যখন তারা উইন্ডোজ ৯৫ নামক একটি অপারেটিং সিস্টেম বাজারে আনে তা পার্সোনাল কম্পিউটারের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। উইন্ডোজ ৯৫ কে বলা হয় আধুনিক অপারেটিং সিস্টেমের জন্মদাতা। তারা উইন্ডোজ ৯৫ তৈরি এবং মার্কেটিং এর জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে যা সত্যি অবিশ্বাস্য। এরকম অবিশ্বাস মার্কেটিং এর কারনে মাত্র ৪ দিনে তারা ১ মিলিয়নের বেশি উইন্ডোজ ৯৫ বিক্রি করে যা তাদের মার্কেট শেয়ার ডাবল করে দেয়।

এর এক বছর পর তারা তাদের ইন্টারনেট ব্রাউজার হিসেবে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার উইন্ডোজ এর জন্য উন্মুক্ত করে দেয় এবং নতুন নতুন স্টার্টআপ কোম্পানি কিনতে থাকে। এসময় তারা অ্যাপল কোম্পানির ১০% শেয়ার কিনে নেয় তাদের প্রোডাক্ট অ্যাপলের ডিভাইসে ব্যবহার করার জন্য।

যেহেতু সে সময় উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম মোট অপারেটিং সিস্টেমের ৯৭% দখল করে ছিল সেহেতু তারা থার্ড পার্টি প্রোগ্রাম ব্যবহার করতে বাঁধা দিত। যার কারনে অ্যামেরিকা সরকার বিল গেটস কে আদালতে নিয়ে যায় এবং তাকে বাধ্য করে থার্ড পার্টি প্রোগ্রাম ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে। এবং এর সাথে সাথেই গেটস মাইক্রোসফটের CEO পদ ছেড়ে দেয়।

মাইক্রোসফটের অধিগ্রহণ করা পণ্য

পর্যায়ক্রমে মাইক্রোসফট নতুন নতুন স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান এবং প্রোডাক্ট কিনে নেওয়া শুরু করে। এদের মধ্যে বেশীরভাগ গুলোই ছিল হয়ত মাইক্রোসফটের বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বী নয়ত ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এরকম প্রোডাক্ট গুলোর মধ্যে স্কাইপ, লিঙ্কডইন, গিটহাব, নোকিয়া সহ এখন পর্যন্ত মোট ২২৫ টি কোম্পানি কিনে নিয়েছে। 

এগুলো ছারাও মাইক্রোসফটের নিজস্ব কিছু প্রোডাক্ট আছে যা অনেক পপুলার। গুগলের মতো তাদেরও একটি সার্চ ইঞ্জিন বিং আছে, অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসের মতো তাদেরও আযুরে নামক ক্লাউড কম্পিউটিং সার্ভিস আছে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের জন্য ভিজুয়াল স্টুডিও এবং গেম খেলার জন্য XBOX আছে।

মাইক্রোসফট কি, কীভাবে তৈরি এবং এর সফলতার পিছনের ইতিহাস জানলাম। এবং তারা কীভাবে প্রযুক্তি জগতের এত বড় কোম্পানি হয়ে গেলো সে সম্পর্কে জানলাম। যদিও পল অ্যালেন এবং বিল গেটস মিলে মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করে কিন্তু বর্তমানে ১,৫৬,৪৩৯ জনের প্রতিষ্ঠান। এবং মাইক্রোসফটের মার্কেট ভ্যালু ১৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মাইক্রোসফট নিয়ে কোন নতুন তথ্য বা মতামত থাকলে কমেন্ট বক্সে জানাবেন এবং সবসময় সুস্থ থাকবেন ধন্যবাদ। 

Leave a Reply