কুখ্যাত হ্যাকার গ্যারি ম্যাকিনন এর জীবনী

কুখ্যাত হ্যাকার গ্যারি ম্যাকিনন এর জীবনী

সিকিউরিটি দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কতো কিছু করা যায় আমরা চলতি সময়ে হরহামেশাই দেখছি। আগামী বিশ্ব হবে তথ্য এবং প্রযুক্তির উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, এই তথ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা এখন থেকেই জরুরী হয়ে পরেছে। 

উইকিলিকস এর বদৌলতে আমরা ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছি তথ্য কতো বড় দামী হাতিয়ার। যাইহোক এই তথ্য হ্যাকারদের কাছ থেকে সুরক্ষিত রাখতে যা দরকার তাই করা হচ্ছে। কিন্তু তবুও কি তথ্যের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে? আজকের লেখায় আমরা কুখ্যাত হ্যাকার গ্যারি ম্যাকিনন এর জীবনী সম্পর্কে জানবো। যে ছিল বিশ্বের সব থেকে বেশি সিকিউর নাসা এবং আমেরিকার মিলিটারি কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করা ব্যক্তি, এটিই এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবথেকে বড় সামরিক সিস্টেম হ্যাকের ঘটনা।  

গ্যারি ম্যাকিনন কে?

কুখ্যাত বা বিখ্যাত যাই বলা হোক গ্যারি ম্যাকিনন ছিলেন অন্য রকম প্রতিভাসম্পন্ন মানুষ। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে তিনি একাই সব থেকে বড় সামরিক নেটওয়ার্ক হ্যাক করেন। ছোট বেলা থেকেই তার এলিয়েন সম্পর্কে জানার অনেক আগ্রহ দেখা দেয়, তিনি এই আগ্রহ মেটানোর জন্য তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। কিন্তু বেশীরভাগ তথ্যই ছিল অসম্পূর্ণ অথবা ক্লাসিফাইড।

বিশ্বসেরা হ্যাকার কেভিন মিটনিক এর জিবনী

জানার প্রচণ্ড আগ্রহ থাকার কারনে তিনি তার হ্যাকিং নলেজ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করার কাজে ব্যায় করেন। তিনি একজন স্কটিশ কম্পিউটার সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এবং হ্যাকার। সে একজন ব্লাক হ্যাট হ্যাকার। হ্যাকিং জগতে ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদের সব থেকে ডেঞ্জারাস এবং ক্ষতিকারক হ্যাকার বলা হয়। সিস্টেম অ্যাক্সেস নিয়ে সিস্টেমের ক্ষতি করাই এদের প্রধান উদ্দেশ্য।

সে দিক থেকে গ্যারি ম্যাকিনন ছিলেন একজন সফল ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার। হ্যাকিং দুনিয়ায় তিনি “Solo” এই নামে পরিচিত ছিলেন। এমন নাম দেওয়ার পিছনে অবশ্য তার একা কাজ করাকে দায়ী করা হয়। তার দ্বারা করা হ্যাকিং এর কারনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭ লক্ষ ডলারের ক্ষয় ক্ষতি হয়। মোটকথা তিনি ইতিহাসের সব থেকে বড় কুখ্যাত ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার।

ব্যক্তিগত জীবন

গ্যারি ম্যাকিনন ১৯৬৬ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে জন্মগ্রহন করেন। সে পেশায় একজন সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এবং ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি কম্পিউটারের সংস্পর্শে আসেন। এবং ১৭ বছর বয়সে তিনি স্কুল ছেড়ে দিয়ে হেয়ারড্রেসার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর কিছু দিন পরেই তিনি তার এক বন্ধুর পরামর্শে কম্পিউটার কোর্স শুরু করেন। কোর্স সম্পন্ন করে তিনি লোকাল এরিয়ায় সার্ভিস প্রদান করা শুরু করেন।

তিনি এলিয়েন এবং ইউএফও নিয়ে অনেক কৌতূহল ছিলেন। তিনি নিজেকে একজন মরাল ক্রুসেডার হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি এসপারজাস সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিলেন। এ রোগে আক্রান্ত মানুষ সাধারণ মানুষের থেকে বেশি মেধাশক্তির অধিকারী হয়। এই রোগের কারনে অবশ্য জীবনে অনেক বড় ধরনের ছাড় পেয়ে যায়।

হ্যাকিং জীবন

গ্যারি ম্যাকিনন তার হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতেন “Solo” নামে। লন্ডনে তার প্রেমিকার আন্টির বাসায় বসে তিনি তার হ্যাকিং জীবন পরিচালনা করেন। পৃথিবীর সব থেকে বড় মিলিটারি হ্যাকিং হয় ২০০২ সালে। নাসা এবং ইউএস আর্মির মোট ৯৭ টি কম্পিউটার হ্যাক করেন।

হ্যাকিং শেখার উপায়

২০০১ থেকে ২০০২ পর্যন্ত টানা ১৩ মাস তিনি নাসা এবং ইউএস আর্মির কম্পিউটার হ্যাক করার পিছনে কাটান। এসময় তিনি অনেক ইম্পরট্যান্ট ডাটা দেখতে পান এবং সংগ্রহ করে রাখেন। পরে অবশ্য তিনি এরকম কোন ডাটা লিক করেননি। কিন্তু এসব সেনসিটিভ ডাটা লিক করলে অনেক বড় ধরনের ডাটা কেলেঙ্কারি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সব থেকে বড় কথা আমেরিকার অনেক গোপন তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে চলে আসতো।

এই পুরো হ্যাকিং কার্যক্রম তিনি একাই পরিচালনা করেন। এই হ্যাকিং এর পিছনে তার বর্ণিত কারন ছিল বিনামূল্যে শক্তি উৎপাদন এবং ইউএফও সম্পর্কে ধারনা নেওয়া। তিনি মনে করতেন নাসা ইউএফও নিয়ে কাজ করছে এবং বিশ্ব থেকে এসব তথ্য লুকিয়ে রাখছে। তিনি এরিয়া ৫১ এ কি কি কাজ হচ্ছে এবং সেখানে আদৌ কোন এলিয়েন আছে কিনা সে সম্পর্কে তথ্য খুঁজে বের করতে চেয়েছিলেন।

তার করা এই হ্যাকিং পুরো বিশ্বের সাইবার জগতে একটি আলোড়ন তৈরি করে। তিনি কম্পিউটারগুলো হ্যাক করে তাদের মধ্যকার একটি কম্পিউটারে ব্যাকডোর তৈরি করার জন্য ভাইরাস সেটআপ করে দিয়ে আসে। তার উদ্দেশ্য ছিল আবার ওই সিস্টেমে পুনরায় অ্যাক্সেস নেওয়া।

তার মেইন টার্গেট ছিল ইউএসএ নেভি, আর্মি এবং বিমান বাহিনী, এর ধারাবাহিকতায় তিনি ইউএস ন্যাভাল নৌবহরের ৩০০ টি কম্পিউটার হ্যাক করেন এবং তাদের অস্ত্র সাপ্লাই সম্পর্কিত যাবতীয় লগ ডিলিট করে দেয়। তার এই কাজের ফলে মার্কিন আমেরিকার সবধরনের অস্ত্র সাপ্লাই স্থগিত হয়ে যায়। তিনি ইউএস আর্মির মোট ২০০০ টি কম্পিউটার ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে রাখেন। এতে আমেরিকা সরকার অনেক বড় সামরিক লসের মধ্যে পরে।

এসব হ্যাকিং এর পর তিনি বিবিসি কে বলেন যে তিনি যে সব ডাটা দেখেছেন তা যদি প্রকাশ করা হয় তাহলে আমরা অনেক নতুন বিষয় সম্পর্কে ধারনা পাব। কারন আমেরিকা সরকার এমন কিছু প্রোজেক্ট নিয়ে কাজ করছে তা যদি জনগনের কল্যাণে প্রয়োগ করা হয় তাহলে মানবজাতির অনেক উপকার হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমেরিকার এমন কিছু উন্নত প্রযুক্তি আছে যা পৃথিবীকে দূষণ, এনার্জির অপ্রাপ্যতা থেকে মুক্তি দিতে পারবে।   

বিচার ও শাস্তি

আমেরিকার ডিফেন্স সিস্টেমের কম্পিউটার গুলো একের পর এক হ্যাক করেই যাচ্ছিলেন তিনি। এসব হ্যাকিং করার কারন জানাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন যে সব গুলো কম্পিউটার উইন্ডোজ দ্বারা পরিচালিত ছিল। এগুলোতে কোন পাসওয়ার্ড বা ফায়ারওয়াল সিকিউরিটি ছিল না।

তিনি আর্মড ফোরস এর ওয়েবসাইট এ একটি নোটিশ পর্যন্ত ঝুলিয়ে দেয়, যেখানে “ইউর সিকিউরিটি ইজ ক্র্যাপ” লেখা ছিল। এরকম একটি লজ্জা জনক ঘটনার পর ইউএস অথোরিটি তাকে গ্রেপ্তার করার উদ্যোগ নেয়।

যেহেতু তিনি আমেরিকার নাগরিক ছিলেন না সেহেতু বিচার সম্পন্ন হওয়া নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। কারন তার করা ক্ষতির কারনে আমেরিকা সরকারের অনেক বড় ক্ষতি হয়। তাকে যদি সব অপরাধের শাস্তি দেওয়া হয় তাহলে মোট ৮০ বছরের জেল খাটতে হবে।

তার উপর যত গুলো চার্জ লাগানো হয় তার সব প্রমাণ হয়। কারন তিনি নিজের পরিচয় গোপন করতেন না। হ্যাকিং করার সময় তিনি নিজের ইমেইল ব্যবহার করতো। তিনি নিজেকে মরাল ক্রুসেডার হিসেবে দাবী করতেন। কারন ৯/১১ এর ঘটনার পর তিনি নিজেকে একজন ওয়ারিওর হিসেবে পরিচয় করাতে চেয়েছিলেন।সকল প্রমান তার বিরুদ্ধে গেলেও তাকে সাঁজা প্রদান করা হয়নি। কারন তার এসপারজাস সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার কারনে তাকে মানুষিক প্রতিবন্ধী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। 

বিশ্বসেরা কয়েকজন হ্যাকারদের জিবনী

তার পক্ষে অনেকেই আন্দোলন করতে শুরু করেন। বিভিন্ন ব্লাক হ্যাট হ্যাকার কমিউনিটি তার পক্ষে দ্বারায় এবং বিবৃতি দেয় যে প্রকৃত অপরাধী গ্যারি নয়। যারা তাদের সিস্টেমের সিকিউরিটি এতো দুর্বল করে রাখে যা একটি ছোট বাচ্চাও হ্যাক করতে পারবে তারাই প্রকৃত অপরাধী। গ্যারির বর্তমান বয়স ৫৪ বছর। বর্তমানে তার অনেক বয়স হয়েছে কিন্তু সে যদি এখনো আমেরিকায় যায় তাহলে তাকে ৭০ বছর জেল খাটতে হবে।

ঘটনাক্রমে গ্যারি ম্যাকিননকে কুখ্যাত হ্যাকার বলি, কারন তিনি একাই অনেক বড় এবং দীর্ঘমেয়াদী সফল হ্যাকিং পরিচালনা করতে সক্ষম হয় এর পাশাপাশি তিনি টার্গেটের অনেক বড় ধরনের ডাটা এবং ফিনান্সিয়াল লস করতে সক্ষম হয়। আমাদের আজকের লেখায় আমরা কুখ্যাত হ্যাকার গ্যারি ম্যাকিনন এর জীবনী সম্পর্কে জানলাম। লেখাটি সম্পর্কে আপনাদের কোন মতামত থাকলে কমেন্ট বক্সে জানাবেন ধন্যবাদ। 

Leave a Reply