ভিপিএন (VPN) কি?

ভিপিএন (VPN) কি? কেন ব্যবহার করে? ভিপিএন ব্যবহার কি অপরাধ?

আমরা চলার পথে বিভিন্ন জায়গায় ফ্রী ওয়াইফাই লেখা দেখি, যেখানে কানেক্ট করে ফ্রীতে ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। কিন্তু ঝামেলা লাগে যখন ফ্রী ইন্টারনেট ইউজ করতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য হ্যাকারের হাতে চলে যায়। এই তথ্য চুরি ঠেকাতে যত কার্যকরী পদ্ধতি আছে ভিপিএন এর মধ্যে অন্যতম। এই পদ্ধতিতে নিজের আইডেন্টিটি লুকিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। যদিও আমরা ব্লক হওয়া ওয়েবসাইট ভিজিট করার জন্য ভিপিএন ইউজ করি কিন্তু এর ব্যবহার শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের আজকের লেখায় আমরা ভিপিএন (VPN) কি? ভিপিএন কেন ব্যবহার করে? ভিপিএন কিভাবে কাজ করে? এবং ভিপিএন ব্যবহার করা কি অপরাধ? এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।

ভিপিএন (VPN) কি?

ভিপিএন বা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক একটি পাবলিক নেটওয়ার্কের মধ্যে সুরক্ষিত কানেকশন তৈরি করার পদ্ধতি। অর্থাৎ ভিপিএন ইউজ করে আপনি আপনার ডিভাইসের আইপি অ্যাড্রেস অন্য আইপি দিয়ে মাস্ক বা হাইড করতে পারবেন।

আপনার আইপি হাইড থাকার কারনে পাবলিক নেটওয়ার্ক থেকে আপনার ডিভাইস খুঁজে পাবে না। এতে আপনার ডিভাইস এবং ডাটা সবকিছু সুরক্ষিত থাকবে। ওপেন ভিপিএন প্রোটোকল ইউজ করার কারনে আপনার সেন্ড করা তথ্য হোস্ট ডিভাইসে সুরক্ষিত পৌঁছে যাবে।এমনকি কোন হ্যাকার যদি আপনার কানেকশন খুঁজে পায় তারপরেও সে আপনাকে বা আপনার ডাটা দেখতে পারবে না। পরিশেষে ভিপিএন বলতে একটি সুরক্ষিত প্রাইভেট নেটওয়ার্ককে বুঝায়।

ভিপিএন কেন ব্যবহার করে?

ভিপিএন আপনি কেন ব্যবহার করবেন তা আপনার কাজের ধরনের উপর নির্ভর করে। সাধারণ ইন্টারনেট ব্রাউজিং বা সোশ্যাল মিডিয়া ঘুরাঘুরির জন্য আপনার ভিপিএন দরকার পরবে না। এর বাইরে অ্যাডভান্স লেভেলের কাজ করতে বা নিজেকে অনলাইনে লুকিয়ে রাখতে আপনার ভিপিএন ইউজ করার প্রয়োজন পরবে। ভিপিএন ব্যবহার করার এমন অনেক কারন নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ব্লক ওয়েবসাইট ভিজিট করতেঃ এইতো কিছুদিন আগেই বাংলাদেশ থেকে অনেকগুলো ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখনো মাঝে মাঝে অনেক ওয়েবসাইট বন্ধ বা ব্লক করে দেওয়া হয়। পর্ন ওয়েবসাইট একযোগে বন্ধ করতে গিয়ে অনেক দরকারি ওয়েবসাইট ব্লক হয়ে গিয়েছিল। তখন সেসব ব্লকড ওয়েবসাইট ভিজিট করতে ভিপিএন ব্যবহার করার প্রয়োজন পরে।

কোন কোন উপায়ে হ্যাকিং করা যায়?

ওপেন ওয়াইফাই ইউজ করতেঃ ভ্রমণ করার সময় আমরা বাস স্টেশন, ট্রেন স্টেশন বা বিমান বন্দরে ফ্রী ওয়াইফাই লেখা দেখে থাকি, বিভিন্ন ইমারজেন্সি প্রয়োজনে বা বোরিংনেস কাটানোর জন্য কর্তৃপক্ষ এসব ফ্রী ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু সিকিউরিটির জন্য এসকল নেটওয়ার্ক কানেকশন খুবই ক্ষতিকারক।

ভিপিএন ব্যবহার করে এসব ওপেন নেটওয়ার্কে সহজেই সিকিউর একটি কানেকশন তৈরি করা যায়। ভিপিএন যেহেতু এনক্রিপটেড কানেকশন ইউজ করে সেহেতু হ্যাকার এই নেটওয়ার্ক খুঁজে পায়না।

ফাস্ট ইন্টারনেট স্পীড পেতেঃ ভিপিএন ইউজ করে ইন্টারনেট কানেকশন স্পীড অনেকগুনে বাড়িয়ে নেওয়া যায়। যদিও সব ভিপিএন বা ফ্রী ভিপিএন এই সুবিধা দেয়না তথাপি অনেক পেইড ভিপিএন এধরনের সুবিধা দেয়।

জিও-রেস্ট্রিক্টেড কনটেন্ট ভিজিটঃ ইন্টারনেটে আমরা যে সকল কনটেন্ট দেখি সবগুলোই যে সবার জন্য উন্মুক্ত এমন নয়। এমন অনেক কনটেন্ট আছে যা অন্য দেশ থেকে দেখা যায় না। এইতো কিছু দিন আগে যখন চ্যাম্পিয়নস লীগের ফুটবল ফাইনাল খেলা হয় তখন লাইভ দেখার কোন স্ট্রং সোর্স ছিল না।

কিন্তু ইংল্যান্ড এর ভিপিএন কানেক্ট করে চ্যাম্পিয়নস লীগের ফেসবুক পেইজে লাইভ দেখা যাচ্ছিলো। এখানে উক্ত লাইভ সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। কিন্তু ভিপিএন দিয়ে সহজেই সেই কনটেন্টে অ্যাক্সেস পাওয়া গিয়েছিল। 

কোন পণ্য বা টিকিট কিনতেঃ আমেরিকার এক স্টেট থেকে আরেক স্টেট যেতে অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিতে হয়। সে জন্য সেখানে বিমান পথ অনেক পপুলার একটি যাতায়াত ব্যবস্থা। সেখানে উড্ডয়ন এবং ল্যান্ডিং এর জন্য বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন দাম নির্ধারণ করা থাকে। অর্থাৎ ভিপিএন ব্যবহার করে আপনি আপনার বর্তমান স্থান পরিবর্তন করে টিকিট কেটে এই সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

অন্যদিকে অনলাইনে পণ্য বিক্রেতা প্লাটফর্মগুলো বিভিন্ন দেশের কাস্টমারদের জন্য আলাদা আলাদা প্রাইস অফার করে থাকে। আপনি ভিপিএন ব্যবহার করে এই সুবিধা নিতে পারেন। কিন্তু এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে আপনাকে অনেক ঝামেলায় পড়তে হতে পারে।

পরিচয় গোপন করতেঃ অনলাইনে আপনার পরিচয় শুধু আপনার ডিভাইসের আইপি অ্যাড্রেস। আপনার আইপি কোনভাবে খুঁজে বের করতে পারলে আপনার ডিটেইলস সহ বর্তমান লোকেশন বের করা যায়। এতে আপনার আইডেন্টিটি সহজেই উন্মুক্ত হয়ে পরার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়াও আপনি যদি নিজে সিকিউরিটি বা হ্যাকিং নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান তাহলে ভিপিএন ইউজ করতেই হবে। কারন এভাবে আপনি নিজেকে গোপন এবং সিকিউর রাখতে পারবেন।  

ভিপিএন কিভাবে কাজ করে?

একটি পাবলিক নেটওয়ার্ক সবার জন্য ওপেন থাকে। ভিপিএন সেই ওপেন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে একটি প্রাইভেট নেটওয়ার্ক তৈরি করে। যেখানে একটি এনক্রিপ্টেড কানেকশন সিকিউর টানেল তৈরি করে আপনার ডিভাইসের ডাটা সেন্ড এবং রিসিভ করে।

আপনার ডিভাইস থেকে যখন ভিপিএন দিয়ে ডাটা সেন্ড করা হয় তখন তা সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড হয়ে সেন্ড হয়। তারপর সে পুরো রুট এনক্রিপ্ট থাকা অবস্থায় চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না হোস্ট ডিভাইসে পৌঁছায়। এটাকে এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন বলে।

ভিপিএন ডাটা ট্র্যান্সফার করার জন্য কয়েকটি প্রোটোকল ইউজ করে। যেগুলো হলো PPTP, L2TP/IPSec, SSTP, IKEv2 এবং OpenVPN প্রোটোকল। এদের মধ্যে ওপেন ভিপিএন বর্তমানে সব থেকে বেশি ইউজ হয়। এই প্রোটোকল একটি ওপেন সোর্স প্রোটোকল। এটি এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন ইউজ করে।

বিশ্বসেরা ৫ টি হ্যাকিং গ্রুপ

ভিপিএন কানেক্ট করে যখন কোন ওয়েবসাইট ভিজিট করার কমান্ড দেওয়া হয় তখন তিনটি বিষয় ঘটে। কমান্ড দেওয়ার পর আপনার ডিভাইস উক্ত রিকোয়েস্ট ভিপিএন কে সেন্ড করে। ভিপিএন সেই রিকোয়েস্ট প্রোটোকল ইউজ করে এনক্রিপ্ট করে তাকে সিলেক্ট করে দেওয়া কান্ট্রি এবং সার্ভারের মধ্য দিয়ে হোস্ট ডিভাইসে পাঠায়। এই সম্পূর্ণ প্রসেস সম্পন্ন হয় খুব সামান্য সময়ে। এই সিকিউর টানেল সিস্টেমের কারনে আইএসপি, সরকার বা হ্যাকাররা আপনার কানেকশনে নজরদারি করতে পারেনা।  

ভিপিএন ব্যবহার করা কি অপরাধ?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিপিএন ব্যবহার করা সম্পূর্ণভাবে ইলিগ্যাল। বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একটি বড় অংশ ভিপিএন ইউজ করে নিষিদ্ধ ওয়েবসাইট ভিজিট করতে। বিশেষ করে পর্ন এবং জুয়া খেলার ওয়েবসাইট।

সরকার এগুলো ওয়েবসাইট ভিজিট করায় সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরেও যখন ইউজ করা হবে তখন তা ক্রাইমের মধ্যে পরে। ভিপিএন ইউজ করার কারনে সেই ব্যবহারকারীর কোন সন্ধান পাওয়া যায়না। গোপনে সেই ব্যক্তি যদি কোন টেরোরিস্ট গ্রুপের সাথে কাজ করে সেটিও জানা যাবে না।

অন্যদিকে পরিচয় গোপন করে সে বিভিন্ন হ্যাকিং কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। ভিপিএন সেই হ্যাকারকে ধরা ছোঁওয়ার বাইরে রাখবে যা সত্যি আতঙ্কের বিষয়। ভিপিএন ব্যবহার করে অপরাধ না করে যদি ভালো কাজে ব্যবহার করা হয় তাহলে হয়ত আইন আরও সহজ হতে পারে। যেমন ভুল করে সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট ব্লক করে দিয়েছে। যে ওয়েবসাইট গুলো আমাদের জন্য সত্যি উপকারী। এক্ষেত্রে ভিপিএন ইউজ করা কখনো আইন ভঙ্গের মধ্যে পরবে না। এরকম কিছু ওয়েবসাইট হলো Mediafire, Reddit ইত্যাদি।

ভিপিএন ব্যবহারের অনেক সুবিধা আছে। যার সঠিক ব্যবহার আমাদের কাজ কর্ম এবং অনলাইন জীবনকে অনেক সহজ আর সাবলীল করে দিয়েছে। সম্পূর্ণ লেখা পড়ে আমরা ভিপিএন এবং এর ব্যবহার ও গুণাবলী সম্পর্কে জানলাম। আশাকরি লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। আপনাদের মনে যদি কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে কমেন্ট বক্সে জানাতে ভুলবেন না ধন্যবাদ। 

Leave a Reply