স্পেস এক্স কি?

স্পেস এক্স কি? স্পেস এক্স এর অজানা ইতিহাস

প্রথম যখন স্যাটেলাইট আবিষ্কৃত হয় মানব সভ্যতা পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে পৌঁছে যায়, যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে চাঁদে মানুষ পাঠানো পর্যন্ত স্যাটেলাইটের ভূমিকা অতুলনীয়। গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে আমরা যে সহজেই অপরিচিত রাস্তা বা যায়গা খুঁজে বের করি তা স্যাটেলাইটের কারণেই সম্ভব হয়েছে। 

মহাকাশ গবেষণার ফলে আমরা এখন আমাদের গ্যালাক্সির পরিসীমা থেকে বের হয়ে ভিনগ্রহের প্রাণী খুঁজতে পারি স্যাটেলাইটের কারনে। বিজ্ঞানের এই বিস্ময়ের কারনে আজ আমাদের জটিল জীবন অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। এর মাধ্যমে সহজ হয়েছে অনেক মানুষের জীবন ও জীবিকা। আমাদের আজকের পোস্টে আমরা এমন একটি মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্পেস ট্রান্সপোর্টেশন কোম্পানির  সাথে পরিচিত হবো যাকে স্পেস এক্স বলা হয়। তো চলুন স্পেস এক্স কি এবং এর ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নেই।

স্পেস এক্স কি?

স্পেস এক্স একটি অ্যারোস্পেস ম্যানুফাকচারার প্রাইভেট কোম্পানি। ২০০২ সালে ইলন মাস্ক হাথর্ন (Hawthorne), ক্যালিফোর্নিয়ায় এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রধান চিন্তা ভাবনা ছিল মহাকাশে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও সহজ ও সহজলভ্য করার। স্পেস এক্স এর প্রধান কাজ হলো পৃথিবীর বাইরে কক্ষপথে থাকা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস ষ্টেশনে কারগো এবং গবেষক পরিবহন করা। এছারাও স্পেস এক্স বিভিন্ন সরকার বা প্রতিষ্ঠানকে স্পেস এ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সাহায্য করে। 

প্রথম দিকে যখন তাদের কার্যক্রম শুরু হয় তখন ইলন মাস্ক পরিকল্পনা করেন যে তারা নিজেরা রকেট বানাবে না, তারা রাশিয়ার কাছ থেকে পুরনো রকেট কিনে সেগুলো মেরামত করে কাজ চালাবে। কিন্তু নানা জটিলতা আর অতিরিক্ত খরচের কথা চিন্তা করে তারা এই পরিকল্পনা বাদ দেয়। কারণ পুরনো রকেট কিনতে যে খরচ হবে তার থেকে র ম্যাটেরিয়াল কেনার খরচের থেকে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ কম। এতো পরিমান খরচ করে পুরনো রকেট নতুন বানানোর থেকে সম্পূর্ণ নতুন বানানোই ভালো হবে ভেবে তারা নিজেরা রকেট বানাবে বলে ঘোষণা দেয়।

রোবটিক্স কী? রোবট কিভাবে কাজ করে?

তাদের তৈরি প্রথম রকেট ফালকন ১ নামক রকেট প্রথম চেষ্টায় অরবিটে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এটিই ছিল কোন প্রাইভেট অ্যারোস্পেস কোম্পানির প্রথম সাফল্য। ২০০৮ সালে ফালকন ১ যখন কক্ষপথে পৌঁছায় তখন এটি ব্যবহার করেছিল লিকুইড রকেট নামক ইঞ্জিন ব্যবস্থা। এই ইঞ্জিনের বিশেষত্ব ছিল এটি লিকুইড প্রোপেলান্ট ব্যবহার করে রকেট ইঞ্জিনকে আরও বেশি গতি সম্পন্ন করে।

স্পেস এক্স মোট ৮৭ টি স্পেস মিশন পরিচানলা করেছে, যার মধ্যে ৮৫ টি মিশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তারা তাদের নিজস্ব  রকেটে মহাকাশে স্যাটেলাইট, যাত্রী এবং কারগো পরিবহনের কাজ করে আসছে এবং এখন পর্যন্ত তারাই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা সফলতায় সবার উপরে আছে। এই কোম্পানির বদৌলতে ইলন মাস্ক এখন বিশ্বের টপ ১০ ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

স্পেস এক্স এর অজানা ইতিহাস

স্পেস এক্স প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে মাস্ক অনেক ভেবে চিনতে তার অনেক পপুলার একটা ব্যবসা পেপ্যাল বিক্রি করে দেয়। এই টাকা থেকে তিনি টেসলা সহ অন্যান্য জায়গায় ইনভেস্ট করেন এবং বেশ কিছু অর্থ তিনি জমিয়ে রাখেন তার এই ড্রিম প্রোজেক্টের জন্য।  

পেপ্যাল বিক্রির টাকা দিয়ে ইলন মাস্ক তার স্বপ্ন পূরন করার জন্য প্রথমে নাসা তে যায়। তার মাথায় আসা সকল আইডিয়া তিনি সেখানে বলেন কিন্তু তাকে খালি হাতেই ফিরতে হয়। কারণ খরচ কমিয়ে কোনোভাবেই মহাকাশ গবেষণা করা সম্ভব নয় বলে নাসা অথরিটির দ্বারা সম্ভব ছিল না। সেখানে ব্যর্থ হয়েই ইলন মাস্ক স্পেস এক্স প্রকল্প হাতে নেয়। এই প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে মাস্ক অনেক ভেবে চিন্তে পেপ্যাল বিক্রি করে দেয়। 

২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া স্পেক্স এক্স ২০০৮ সালে ফালকন ১ রকেটের সফল উড্ডয়নের দ্বারা সফলতা পায়। এরপর ২০১০ সালে তারা সফলভাবে কোন স্পেসক্রাফট ড্রাগন  মহাকাশে প্রেরণ করে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পারে। যা রকেটের ইতিহাসে ছিল একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। এর আগে কোন কোম্পানি বা সরকার এই কাজ করে দেখাতে পারেনি। এমনকি নাসা নিজেও এই সফলতা অর্জন করতে পারেনি। ২০১৫ সালে স্পেস এক্স আরও একটি রেকর্ড তৈরি করে যা এখন পর্যন্ত সবার কাছে বিস্ময় ছাড়া আর কিছুই না। 

ইন্টারনেট কি? ইন্টারনেটের মালিক কে?

এইতো কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমরা জানতাম যে স্পেস এ যে রকেট পাঠানো হয় তা আর অক্ষত ফেরত আনা যায়না। তাই প্রতিটি স্পেস ট্রান্সপোর্টকে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু স্পেস এক্স এই সমস্যার সমাধান করে খুব সহজেই। তারা কোন মহাকাশযান নিক্ষেপের পর তা আবার সেফ ভাবে ল্যান্ডিং করানোর প্রযুক্তি আবিষ্কার করে ফেলে এবং ২০১৫ সালে ফালকন ৯ এ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফলভাবে ল্যান্ডিং করানো হয়। এর থেকেই রকেট পুনরায় ব্যবহার করার সিস্টেম চালু হয়ে যায়। এবং অরবিট থেকে ঘুরে আসা ফালকন ৯ আবার ২০১৭ সালে মহাকাশে সফলভাবে প্রেরণ করা হয়।

স্পেস এক্স এর রকেট সংখ্যা এবং উপার্জন

এখন পর্যন্ত স্পেস এক্স এর সব মিলিয়ে ১০ টি স্পেস রকেট আছে এর মধ্যে স্টারশিপ (Starship) রকেট তৈরি প্রক্রিয়া চলছে, এটি মূলত চাঁদ এ যাত্রী পরিবহণে জন্য তৈরি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা দুইটি টিকিট বিক্রি করে ফেলেছে। যার মূল্য ধরা হয়েছে যাত্রী প্রতি ২ মিলিয়ন ইউ এস মার্কিন ডলার।

তাদের Falcon 1e, Falcon 5 এবং Falcon 9 Air এই তিনটি রকেট শুরুতেই বাতিল হয়ে যায়। বর্তমানে Falcon 1, Falcon 9 v1.0, Falcon 9 v1.1 এবং Grasshopper এই চারটি রকেট অবসর গ্রহণ করেছে। বর্তমানে স্পেস এক্স এর সকল ধরণের ট্রান্সপোর্টেশন সচল রাখার জন্য Falcon “Full Trust” এবং Falcon Heavy এই দুইটি রকেট চালু আছে। এদের মধ্যে ফালকন হেভি অনেক শক্তিশালী এবং উচ্চগতিসম্পন্ন। 

ফালকন হেভি তৈরির মূল লক্ষ ছিল এর দ্বারা পৃথিবীর যে কোন যায়গায় সার্ভিস পৌঁছে দেওয়া এবং এর ইঞ্জিন এতো শক্তিশালি যে সহজেই এটি পুরো পৃথিবী ভ্রমণ করে আসতে পারবে। এই অতিমানবীও শক্তির জন্য একে হেভি লিফটিং স্পেস লঞ্চ ভেহিকল বলা হয় এবং এর উৎক্ষেপণের জন্য মোট ২৭ টি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে।  

গুগল কিভাবে তৈরি হলো?

স্পেস এক্স তাদের প্রাইসিং বা মূল্য কখনোই প্রকাশ করে না। তবে তাদের সার্ভিস ব্যবহার করতে হলে একটি ন্যূনতম ফি দিতে হবে। তাদের সার্ভিস ফি হলো ৫৬.৫ মিলিয়ন ডলার, যা তাদের প্রতিটা রকেট উৎক্ষেপণে দিতে হবে। এর বাইরে আপনাকে আরও কিছু অর্থ দিতে হয় যা নির্ভর করে ওজন এবং দূরত্বের উপরে। ২০১৭ এবং ২০১৮ এই দুই বছরে স্পেস এক্স মোট ২২ টি মিশন পরিচালনা করে এবং এর থেকে মোটামুটি ৮৫০ মিলিয়ন ইউ এস মার্কিন ডলার আয় করে।

স্পেস এক্স এর কাস্টমার কারা?

স্পেস এক্স এর প্রধান কাজ হলো ট্র্যান্সপোর্টেশন। এই কারনে মহাকাশ সম্পর্কিত যত প্রতিষ্ঠান আছে তারা এর কাস্টমার। এদের মধ্যে নাসা, আমেরিকার ডিফেন্স মন্ত্রণালয়, বড় বড় টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠান, স্যাটেলাইট প্রেরণ করা দেশ ইত্যাদি অন্যতম। যেমন বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ স্পেস এক্স এর Falcon 9 দ্বারা অরবিটে প্রেরণ করা হয়।

স্পেস এক্স এর বর্তমান প্রকল্প

স্টারলিংক (StarLink) নামক একটি প্রকল্প যা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করবে। এই প্রকল্পের জন্য স্পেস এক্স মোট ৪২ হাজার স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণ করবে, যার কাজ হবে লেজার টেকনোলজি ব্যবহার করে পৃথিবীর প্রতিটা জায়গায় ইন্টারনেট সেবা দেওয়া। ইতিমধ্যে ৮০০ স্যাটেলাইট প্রেরনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।এটি যদি সম্ভব হয় তাহলে পৃথিবী অনেক অনেক দূর এগিয়ে যাবে এবং যোগাযোগ অনেক সহজ হবে।

স্পেস এক্স একটি বিস্ময়ের নাম। কারণ এই প্রতিষ্ঠান তাদের নিত্য নতুন উদ্ভাবনের দ্বারা আমাদের মানব জাতি কে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মহাকাশে ভ্রমণ করা যেখানে আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না, তা স্পেস এক্স বাস্তব করে দেখাচ্ছে। পুরো পোস্ট পরে আমরা স্পেস এক্স সম্পর্কে সকল বিষয় জানলাম। এর বাইরে আপনার যদি কোন কিছু জানার থাকে তাহলে আমাদের কমেন্ট বক্সে জানাবেন ধন্যবাদ।

Leave a Reply