বিশ্বসেরা হ্যাকার কেভিন মিটনিক

বিশ্বসেরা হ্যাকার কেভিন মিটনিক এর জীবন কাহিনী

হ্যাকিং কি এই সম্পর্কে আমাদের সবার কম বেশি ধারনা আছে। হ্যাকিং কে আমরা সচরাচর অপরাধ হিসেবে জানলেও এটি হ্যাকিং করার উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে। আমরা বিভিন্ন সময় সাইবার ওয়্যার নামক যে ইন্টারনেট যুদ্ধের কথা জানি তা সম্ভব হয়েছে হ্যাকারদের কারনে। 

এইতো কিছুদিন আগে ফ্রান্স এর বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি ওয়েবসাইটে বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে এক যোগে সাইবার হামলা করা হয়। হ্যাকারদের দ্বারা করা এই সাইবার হামলা ছিল দেশ, জাতি ও ধর্মের জন্য। এটি নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ ছিল অর্থাৎ হ্যাকিং শুধু খারাপ কাজেই ব্যবহার হয়না ভালো কাজেও  ব্যবহার হয়। হ্যাকিং করে বিশ্ব জয় করে নেওয়া এমন লিজেন্ট হাতে গোনা যে কয়েকজন আছে কেভিন মিটনিক তাদের মধ্যে অন্যতম। তাকে একাধারে কুখ্যাত এবং বিখ্যাত হ্যাকার বলা হয়। আমাদের আজকের পোস্টে বিশ্বসেরা হ্যাকার কেভিন মিটনিক এর জীবন কাহিনী সম্পর্কে জানবো।

কেভিন মিটনিক কে?

কেভিন মিটনিক বর্তমানে একজন সিকিউরিটি কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করলেও মূলত তিনি একজন হ্যাকার ছিলেন। ১২ বছর বয়স থেকে তিনি হ্যাকিং জীবনে প্রবেশ করেন। তার প্রধান পারদর্শিতা হলো সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। ছোট বেলায় জাদু নিয়ে তার অনেক আগ্রহ থাকায় মানুষকে ম্যানুপুলেট করার এক অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেন।

তিনি প্রথম জীবনে হ্যাকিং করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ডাটা সংগ্রহ করলেও তা বিক্রি করে নিজের কাজে ব্যবহার করেনি, তবে এসব অবৈধ অনুপ্রবেশের কারনে পুরো আমেরিকা জুড়ে তার একটি খারাপ পরিচয় প্রকাশ হয়ে যায়।

হ্যাকিং কিভাবে শিখবেন? হ্যাকিং শেখার উপায় জানতে এখানে ক্লিক করুন

হ্যাকিং ছেড়ে দিয়ে তিনি বর্তমানে একজন সাধারণ মানুষ হয়ে গিয়েছেন। হ্যাকার হিসেবে কম্পিউটার আর ইন্টারনেট দুনিয়ায় প্রবেশ করলেও তিনি এখন একজন সিকিউরিটি কোম্পানির মালিক। তার কোম্পানি এফবিআই সহ আরও প্রায় ৫০০ সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানির কর্মচারীদের ইথিক্যাল হ্যাকিং শিখিয়ে থাকে এবং সিকিউরিটি বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শ দেয়।

ব্যক্তিগত জীবন

কেভিন মিটনিক বা কেভিন ডেভিড মিটনিক ১৯৬৩ সালে আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে জন্মগ্রহন করে। তিনি মনরো হাই স্কুল থেকে তার লেখাপড়া শুরু করেন এরপর তিনি পিয়ার্সি কলেজে ভর্তি হন। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যালোলিনায় তার ইউনিভার্সিটি লাইফ শুরু করেন। কেভিন মিটনিক বাদেও তার আরও তিনটি ছদ্ম নাম আছে। এদের মধ্যে কেভিন ডেভিড মিটনিক তিনি তার পিতা থেকে পেয়েছেন। দ্য কনডোর ছিল তার অন্যতম হ্যাকিং পরিচয়। এরিক ওয়েইস নামটি সে তার জাদু গুরুর থেকে পেয়েছে এবং দ্য ডার্কসাইড হ্যাকার নাম ইউজ করে সে তার হ্যাকার পরিচয় দেয়।

স্কুল জীবনে তিনি একজন রেডিও অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। কিছুদিন সে স্টিফেন এস. ওয়াইস নামক একটি ইহুদী মন্দিরে রিসিপশনিস্ট হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি বনি ভিটেলো কে বিয়ে করেন এবং ১৯৯০ সালে আবার তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়।

ব্যক্তিগত জীবনে কেভিন মিটনিক একজন হ্যাকার, লেখক, পাবলিক স্পীকার এবং সিকিউরিটি এক্সপার্ট। বর্তমানে সে মিটনিক সিকিউরিটি কন্সাল্টিং এর মালিক এবং KnowBe4 এর চিপ হ্যাকিং অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

হ্যাকিং জীবন

ছোটবেলা থেকেই কেভিন হ্যাকিং এর দিকে ঝুঁকে পরেন। তার বাল্যকাল আর সবার মতো স্বাভাবিক ছিল না, কারন তার মা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কাজের সন্ধানে দৌড়াদৌড়ি করতো। সে কারনে সে ভালো কোন মানুষের বা বন্ধুর সঙ্গ পায়নি। লস এঞ্জেলেসের বাস গুলোতে ফ্রীতে ভ্রমণ করার জন্য তিনি পুরো বাস সিস্টেমের কার্ড-পাঞ্চিং সিস্টেম হ্যাক করে। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি ফেলে দেওয়া একটি অব্যবহৃত স্লিপ থেকে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি এই কাজ করেন।

লিনাক্স কি? জানতে এখানে ক্লিক করুন

কেভিন তার হ্যাকিং কার্যক্রম শুরু করে টেলিফোন লাইন ব্যবহার করে। প্রথম তিনি নিজেকে পুলিশ অফিসার পরিচয় দিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া ডিপার্টমেন্ট অফ মোটর ভেহিকেলসে ফোন করেন। সেখানে তার কাছে রিকোয়েস্টার কোড চাওয়া হলে তিনি তখন নিজেকে ডিপার্টমেন্ট অফ মোটর ভেহিকেলসের একজন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে রিকোয়েস্টার কোড ভেরিভাই করতে বলেন। এভাবে তিনি ডিপার্টমেন্ট অফ মোটর ভেহিকেলস থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় সকল গাড়ির তথ্য, নাম্বার প্লেট, মালিকের নাম জেনে নিতে পারতেন।

প্রথম তিনি প্রশাসনের নজরে আসেন একটি গবেষণা কেন্দ্রের সিস্টেমের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে। এরপর সেই একই কম্পিউটার থেকে তার বন্ধু উক্ত সিস্টেমে প্রবেশ করে এবং ধরা পরে যায়। তারপর সকল ডস মিটনিকের উপর চাপিয়ে দেয়। এতে এফবিআই তাকে আন্ডার এজ হিসেবে হুঁশিয়ারি দিয়ে ছেড়ে দেয়।

ইউএস লিজিং নামক একটি বড় কোম্পানির সিস্টেম হ্যাক করে মিটনিক প্রথম শাস্তির আওতায় চলে আসে। তিনি এবং তার বন্ধু ল্যুইস দুইজনে মিলে এই হ্যাকিং পরিচালনা করে। পরে ল্যুইসের প্রেমিকা পুরো হ্যাকিং পদ্ধতি ফাঁস করে দেয় এবং মিটনিককে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়। যাইহোক, মিটনিক হ্যাক করার জন্য নিজেকে টেকনিশিয়ান পরিচয় দিয়ে ইউএস লিজিং কোম্পানিকে জানায় তাদের সিস্টেমে বাগ আছে। যথা সময়ে বাগ না সরালে তাদের সিস্টেম ক্রাশ করবে এবং সকল তথ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। এতেই তারা তাকে ইউজার এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে দেয়। এভাবেই তিনি সফলভাবে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি প্রয়োগ করতেন।

সান্তা ক্রুজ অপারেশন নামক একটি সফটওয়্যার কোম্পানি হ্যাক করার জন্য মিটনিককে ১.৪ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়। পরে তার সিস্টেমের দুর্বলতা দেখিয়ে দেওয়া এবং ঠিক করে দেওয়ার শর্তে তাকে জরিমানা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

৯০ দশকে নোকিয়া, মটোরলা এবং এনইসি এর সিস্টেম হ্যাক করে তিনি এদের সোর্স কোড অন্য সার্ভারে ডাউনলোড করতে সক্ষম হয়। সফল হ্যাকিং করতে পারলেও এনইসি হ্যাকিং এর সময় তিনি ধরা পরে যায়।

ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনি বেশীদিন অবস্থান করতে পারেনি। নিজের পরিচয় বদলে তিনি লাস ভেগাস চলে যান। সেখানে বেশীদিন না স্থায়ী হয়ে ডেনভার চলে যান। সেখান থেকে আবার সিয়াটল চলে যেতে হয়। আইনের আওতা থেকে বাঁচার জন্য তিনি স্থান পরিবর্তন করতেন। এভাবেই হ্যাকিং বন্ধ করার আগে পর্যন্ত তিনি নানান জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছেন।

তার পাওয়া শাস্তি ও জরিমানা

ইউএস লিজিং এর সিস্টেম হ্যাক করার কারনে তাকে তাকে কিশোর অপরাধের আওতায় ৯০ দিন পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছিল। সান্তা ক্রুজ অপারেশন নামক সফটওয়্যার কোম্পানি হ্যাক করার কারনে তাকে ১.৪ মিলিয়ন এবং তার বান্ধবীকে ১.৪ মিলিয়ন করে মোট ২.৮ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়। পরবর্তীতে সান্তা ক্রুজ অপারেশন কোম্পানিকে সহযোগিতা করার শর্তে জেল ও জরিমানা থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু তা সত্তেও তাকে ৩ বছর আন্ডার সারভিলেন্সে থাকতে হয়।

বিশ্বসেরা কয়েকজন হ্যাকারদের কর্মকান্ড

এরপর ১৯৯৫ সালে তাকে আবার আইনের আওতায় আনা হয়। এবার আদালতে তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ সত্যি বলে প্রমানিত হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি ২৩ টি ফোনকল ক্লোন করেছে এবং প্রায় ২০ হাজার ক্রেডিট কার্ড জাল করেছে। ফোন কল জাল করার জন্য তাকে মোট ৪৬০ বছর এবং ক্রেডিট কার্ড জাল করা এবং অন্যান্য কোম্পানি হ্যাক করার জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবী করা হয়। পরে ফ্রী কেভিন মুভমেন্ট এর কারনে তার সাঁজা কমিয়ে ৫ বছরের জেল এবং ৪,১২৫ ডলার জরিমানা ধরা হয়।

তার বর্তমান জীবন

বর্তমান জীবনে কেভিন একটি সিকিউরিটি কোম্পানির মালিক। তার লেখা “The Art of Deception” বই ২০০২ সালে আমেরিকার সবথেকে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের সন্মান পায়। তিনি বর্তমানে একজন পাবলিক স্পীকার। বিভিন্ন প্রোগ্রাম বা কনভেনশনে তিনি সিকিউরিটি নিয়ে আলোচনা করেন। বিভিন্ন কোম্পানিকে সিকিউরিটি শক্ত করার পরামর্শ দেন। তার বেস্ট সেলিং বই বের হওয়ার পর “The Art of Intrusion”, “Ghost in the Wires” এবং “The Art of Invisibility” বই লেখেন।

পুরো লেখায় আমরা কেভিন মিটনিক এর কুখ্যাত থেকে বিখ্যাত হওয়া জানলাম। হ্যাকিং এর জ্ঞান কাজে লাগিয়ে যে মানুষের উপকার করা যায় তার একটি বড় উদাহরণ তিনি। আশাকরি আজকের লেখা পড়ে আপনাদের ভালো লেগেছে। কোন প্রশ্ন জানার থাকলে কমেন্ট করে জানাবেন ধন্যবাদ।

Leave a Reply